-
-
-
আজকে আমরা দেখবো কি করে বাসার আশেপাশে স্বল্প জাগায় কিংবা টবে শীতকালীন সবজী শিমের আবাদ করতে পারি ।
-
-
বীজ নির্বাচনে এরটু সতর্কতা অবলম্বন করুন । চেষ্টা করুন পরিনত এবং সুস্হ্য বীজ নির্বাচন করতে ।
-
-
-
শিমের যত্ন ও পরিচর্যা:
শিম গাছের নিয়মিত যত্ন করতে হবে। গাছের গোড়ায় যদি আগাছা জন্মে তাহলে আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে। মাঝে মাঝে অতিরিক্ত আগা ও লতাপাতা ছাটাই করে দিতে হবে। টবে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। গাছের গোড়াই অনেক বেশী পরিমাণে মাটি দিতে হবে। গাছ লতিয়ে গেলে বেধে দিতে হবে। গাছে ফুল আসলে পুরুষ ফুলের পরাগধানী হতে পরাগরেণু সংগ্রহ করে স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে স্থানান্তরের মাধ্যমে পরাগায়ন (কৃত্রিম পরাগায়ন )ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া সম্ভব।
-
-
-
শিম হলো এক ধরণের লেগুমিনাস উদ্ভিদ, যা বাংলাদেশে এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা অঞ্চলে জনপ্রিয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Phaseolus vulgaris। শিমের বীজ ও ফল উভয়ই খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আপনি ইচ্ছা করলে আপনার বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাটের বারান্দা, পারগোলা , ডেক কিংবা backyard এর ছোট্ট এক চিলতে জাগাতেও শীতকালীন সবজি শিমের চাষ করতে পারেন খুব সহজে । এই শহবে আমাদের বাড়ী গুলোতে খুব একটা জায়গা থাকে না , আবার কিছুটা থাকলেও আগাছার ভয়ে (weed ) হয় কৃত্তিম ঘাস দিয়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধির চেষ্টা থাকে, না হয় পেভাস কিংবা কংক্রিট দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে প্রাকৃতিক ঘাস পরিচর্য়ার এড়ানো চেষ্টা থাকে । এতে সাময়িক প্রশান্তি পাওয়া যায় বটে তবে পরিবেশ সহায়ক তা বলা যায় না । কেননা কৃত্তিম ঘাস, পেভাস কিংবা কংক্রিট সামারে খুব তাড়াতাড়ি উত্তপ্ত হয়ে বাসার আশপাশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সহায়ক উপাদানে পরিনত হয় । বৃহত্তর পরিসরে চিন্তা করলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা (Global warming ) বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কৃত্তিম ঘাস, পেভাস কিংবা কংক্রিট সহায়ক । সাম্প্রতিক একটা প্রতিবেদনে দেখলাম - অস্টেলিয়ার পাড়া গুলোর তাপমাত্রারা দ্রুত বৃদ্ধি অন্যতম কারন কৃত্তিম ঘাস, পেভাস কিংবা কংক্রিট এর ব্যপক ব্যবহার ।এটাও ঠিক যে ব্যস্ততম জীবনের পরও আমরা কিন্তু বাসার সৌন্দর্যটাও গুরুত্ব দিয়ে থাকি । সে ক্ষেত্রে এই সব কৃত্তিম উপাদান ব্যবহারের পরেও বাড়ীর আশপাশে কিছুটা প্রাকৃতিক সবুজ উপাদানের কথা চিন্তাভাবনায় রাখতে পারি । ছোট্ট পরিসরে হলেও টবে সবজীর চাষাবাদ সে ক্ষেত্রে তেমনই একটা ইতিবাচক চিন্তা হতে পারে । অনেকটা ছাদ বাগানের চাষাবাদের মতই বলা চলে।
ক্যানবেরা অঞ্চলে শিমের চাষের জন্য আদর্শ সময় হলো বসন্ত মৌসুমের শেষ থেকে শুরু তবে গ্রীষ্মের শেষ পর্যন্ত এই সময়ে মাটি উষ্ণ এবং আবহাওয়া অনুকূল থাকে, যা বীজের অঙ্কুরণ ও বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন।
শিমের জন্য উষ্ণ এবং সূর্যালোকপূর্ণ পরিবেশ আদর্শ। এটি ভালোভাবে সু-নিষ্কাশিত মাটিতে ভালো জন্মে। ক্যানবেরার গ্রীষ্মকালের শুষ্ক আবহাওয়া শিম চাষের জন্য উপযুক্ত।
ক্যানবেরার বাংগালীদের মাঝে দুই ধরনের শিম চাষ বেশ জনপ্রিয় । লাল এবং সবুজ জাতের শিম । লাল শিমটা বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা কেন্দ্রের উদ্ভাবন ।গাছটা বেশী বড় হয় না , ফলনও প্রচুর । স্বল্প জায়গায় চাষাবাদের জন্য খুবই উপযোগী। সবুজ জাতের শিমটার জন্য একটু বেশী জায়গা এবং মাচার প্রয়োজন হয়।
শিমের সাথে টমেটো, ক্যাপসিকাম, এবং মরিচের মতো উদ্ভিদ ভালোভাবে সহজীবন করে। সাথী ফসল হিসেবে এসবের চাষে মাটির উর্বরতা যেমন বাড়ে তেমনী কীটপতঙ্গের নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হিসাবে কাজ করে ।
তবে যেহেতু আমাদের জায়গাঁর স্বল্পতা রয়েছে এবং টবে চাষ করার চিন্তা করছি সে ক্ষেত্রে টবে শিমের সাথে অন্য সাথী ফসল না দোয়াই ভালো। তবে যাদের বড় জাগাতে শিম চাষের সুযেগ আছে , তারা সাথী ফসলের কথা ভেবে দেখতে পারেন ।
শিমের প্রধান শত্রু হলো আফিড এবং মাইট। এগুলি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাকৃতিক পদ্ধতি যেমন- ২/৩ দিন ভিজিয়ে রাখা পেয়াজ কিংবা রসুনের খোসার পানি , অল্প পরিমানে লিকুইড সাবান মেসানো পানি বা নির্দিষ্ট কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে তবে যেহেতু
অর্গানিক চাষাবাদ আমাদের লক্ষ্য সে ক্ষেত্রে কীটনাশক ব্যবহার থেকে বিরত থাকাটাই উত্তম ।
শিমের চাষের জন্য রোগ প্রতিরোধী এবং উচ্চ ফলনশীল বীজ নির্বাচন করা উচিত।
শিম বীজ প্রাপ্তির সহজ লভ্যতাঃ
আমাদের এখানকার দোকান গুলো যেমন Bunnings এ দেশি বীজ পাওয়া যায়না । অন লাইনে কেনাটাও নিরাপদ না । Australian Biosecurity Authority এ ব্যপারে নানা বিধি নিষেধ রয়েছে । আমাদের ভবিষৎ পরিকল্পনা রয়েছে দেশী সাঁক সবজির “সিড ব্যাংক” গড়ে তোলার । আশা করছি - আমাদের এই App এর মাধ্যমে নিকট ভবিষ্যৎ এ ব্যপারে ঘোষনা দিতে পারবো।
শিম চাষে টব বা মাটি তৈরি পদ্ধতি:
একটা মোটামুটি বড় কিংবা মাঝারি সাইজের টব নিতে হবে। আমাদের সবারই একটা ধারনা থাকে টব পুরোটাই মাটি দিয়ে ভড়ে নিলে হয়। আসলে এই ধারনাটা কিন্তু পুরোপুরি সঠিক নয়।টবটা তিনটা অংশে বিভক্ত করে চিন্তা করতে পারি, প্রথম অংশটা ফেলে দেয়া cardboard ছোট ছোট করে ছিঁড়ে কিংবা অব্যবহৃত কাগজ ছিঁড়ে অথবা গাছপালার পুরানো ঠালপালা অথবা পাতা দিয়ে ভড়ে নিতে হবে , তারপরের অংশটা বাসার উচ্ছিষ্ট যেমন শাক সবজির ফেলে দেয়া অংশ কফি কিংবা চা পাতার ব্যাগ এ সব দেয়া যেতে পারে আর সবচেয়ে উপরের অংশটা potting mix ( Bunnings কিংবা Aldi, Coles , woolworths এর ও হতে পারে) এর সাথে জৈব সার গোবর কিংবা ভেরা ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে । এই পদ্ধতিতে টবে তৈরি করার সুবিধা হচ্ছে টবের নিচের দিকে ছোট ছোট air pocket থাকে যা গাছপালার শিকরে অক্সিজেনের সরবরাহতে সহায়তা করে এবং এতে গাছ সুস্হ্যতা পায়। আরও একটা উপকারিতা হচ্ছে - নিচের দিকের কাগজ,ঠালপালা ধিরে ধরি পচে মাটিতে পরিনত হয় ।
শিম বীজের খোসা কিছুটা শক্ত। তাই সহজ অংকুরোদগমের জন্য শুধু পরিস্কার পানিতে ১৫-২০ ঘন্টা অথবা Seasol মেশানো পানিতে এক রাত্রি ভিজিয়ে তারপর ছোট ছোট প্লাস্টিকের টবে বপন করতে হবে।
শিমের চারা টবে বপন ও পানি সেচ
বীজ থেকে চারা উৎপাদিত হলে, টবে সবল সুস্থ্য চারা রেখে দুর্বল চারা উপড়ে ফেলতে হবে। চারার বৃদ্ধির প্রথম দিকে নিয়মিত পানি এবং সপ্তাহে একবার সীসল মিশ্রিত পানি দিতে হবে। পরবর্তীতে অতিরিক্ত গরম পড়লে বেশী পানি দিতে হবে।
শিমের বীজ থেকে চারা তৈরির পদ্ধতি এবং সঠিক সময়:
শিমের ক্ষেত্রেও কিন্তু আমরা লাউ চাষের তিন ধাপ পদ্ধতি অনুসরন করবো ( আমার আগের প্রতিবেদন “ ক্যানবেরাতে লাউ চাষ” এ এর বিস্তারিত পাবেন)
ধাপঃ ১
বীজ বপন - আগস্টের শেষে ( ঘরের মধ্যে )
ধাপঃ ২
পরিনত চাঁড়া বাইরে নিরাপদ জাগায় রাখতে হবে
( পরিবেশের সাথে সহনশীল হয়ে উঠবে)
ধাপঃ ৩
মাটির তাপমাত্রা উষ্ণ হলে তারপরই কেবল লাগানোর চিন্তা করতে হবে। ( ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অথবা মাসের মাঝামাঝি )
এখানে যে বিষয়টার উপর গুরুত্ব দিতে হবে তা হচ্ছে - বীজ থেকে সতেজ চাঁড়ার উৎপাদনের সাফ্যলের উপরই কিনতু ফলনের সাফল্য নির্ভর করে ।
বাউনি বা মাচা দেয়া
টবে শিমের চাষাবাদ পদ্ধতি:
গাছের চারা একটু বড় হলে একটা ছোট লাঠি অথবা যদি বাঁশের ছোট ছোট লাঠি ( Bunnings এ পাওয়া যাবে) পাওয়া যায় তা দিয়ে গাছকে বেঁধে দিতে হবে। যেহেতু আমরা টবে চাষাবাদ করছি , সে ক্ষেত্রে মাচা না দিয়ে “টাওয়ার পদ্ধতি” তা অনুসরন করবো। আমি যেটা করি - Green shed থেকে ফেলে দেয়া লোহার নেট গোল করে বেশকিছুটা লম্বা করে টাওয়ারের মত করে টবের কোনার দিকে ২/৩টা লাঠির সাহায্যে শক্ত করে বেধে দেবো । গাছে নিয়মিত যত্ন নিতে হবে। এবং শিম গাছের গোড়ায় সবসময় মাটি দিতে হবে। শিম গাছ ছেটে দিলো গাছ ঝোপালো হয় ফুল ফল বেশি হয়।
অর্গানিক বা জৈব চাষাবাদ যেহেতু আমাদের উদ্দেশ্য সেহেতু - জৈব সার যেমন গরু, ভেড়া কিংবা ছাগলের সার কেই প্রাধান্য দিবো ।
Bunnings থেকে এই সব সার সংগ্রহ করা যেতে পারে, তবে Jamison Sunday Market থেকে কিছুটা স্বল্প মূল্যে এবং বেশী পরিমান সংগ্রহ করা যায়। । এদের বাসায় পৌছে (Home Delivery) দেয়ার ব্যবস্হাও আছে ।
এর বাইরে নিয়মিত সপ্তাহে ২/৩ দিন Seasol Seaweed Garden Solution ( Bunnings কিংবা সাধারন সুপার মার্কেট গুলোতেও পাওয়া যায়) দিতে হবে ।
জমি থেকে নিয়মিত আগাছা তুলে ফেলা প্রয়োজন। এটি শিমের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ কমায়।
টবে যাতে আগাছা না হয় , সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে । প্রয়োজন বেধে মালচিং এর ব্যবস্হা করতে হবে । এতে মাটির আর্দ্রতা যেমন রক্ষা হয়, পাশাপাশি সহজে আগাছা জন্মাতে পারে না ।
কি দিয়ে মালচিং করবো ?
বিভিন্ন ধরনের Mulch কিনতে পাওয়া যায় । তবে Sugar Cane Mulch টবে চাষাবাদের ক্ষেত্রে বেশী সহায়ক । এর অন্যতম সুবিধা হচ্ছে দ্রুত পচে গিয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।Hay ( খড়) ব্যবহারেও এই সুবিধাটা পাওয়া যায়।
কোথায় পাবো?
Bunnings এ বিভিন্ন ধরনের Mulch পাওয়া যায় । সামারে কখনও কখনও Aldi তে থাকে।
Jamison Sunday Market থেকে Hay (খড়) কিনতে পারেন। স্হানীয় এক কৃষক বিক্রি করে, বললে বাসায় পৌছে দেবে।
শিম গাছে পোকামাকড় দমন ও বালাইনাশক:
যেহেতু আমরা জৈব পদ্ধতি অনুসরন করে চাষাবাদ করছি সেহেতু - যদি রোজমেরি গাছ থাকে তাহলে রোজমেরি ঢালপালা শিম গাছের গোড়া পুরো টব জুড়েই ছড়িয়ে দিতে পারেন ।
সপ্তাহে ২/৩ বার পেঁয়াজের খোশা ভেজানো পানি সাথে পরিমান মত ঝাঁলের গুঁড়া মিশিয়ে স্প্রে
করতে পারেন।
পাশাপাশি গুঁড়া সাবান মেসানো পানিরও স্প্রে করতে পারেন।
শিম গাছের কান্ড শুকিয়ে যাওয়া বলে এক ধরনের রোগ হতে পারে । সে ক্ষেত্রে রোগ আক্রান্ত গাঁছ তুলে নিরাপদ জাগায় ফেলে দিতে হবে ।
ফলি পরিপক্ক হলে তা সংগ্রহ করা হয়। পুরোপুরি পাকা শিমের ফলি সবচেয়ে স্বাদু এবং পুষ্টিকর হয়।
শিম হলো উচ্চ প্রোটিন এবং ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার। এটি হার্ট এবং রক্তনালীর স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।