-
-
-
-
-
-
-
-
-
-
-
-
-
-
পরবাসে লাউ চাষ বিহীন কৃষক, লবন ছাড়া ডালের মতই ।আজকের আয়োজনে থাকছে ক্যনবেরার লাউ চাষের কলাকৌশল নিয়ে।
পরবাসে লাউ চাষ বিহীন কৃষক, লবন ছাড়া ডালের মতই ।আজকের আয়োজনে থাকছে ক্যনবেরার লাউ চাষের কলাকৌশল নিয়ে।
আগেই বলেছি ক্যানবেরার মাটির তাপমাত্রা নভেম্বরের শেষ বা ডিসেম্বর না আসা পর্যন্ত পর্যাপ্ত উত্তপ্ত হয় না বলে লাউ গাছ কিংবা বিচির জন্য মোটেই সহায়ক হয়ে উঠ্না । যারা সরাসরি লাউ বিচি মাটিতে লাগাতে চান অবশ্যই তাদের ডিসেম্বর আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত । তবে যারা একটু প্রগতিশীল চাষী তারা কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষে বা অক্টোবরের শুরুর দিকে লাউ চাষের প্রস্তুতি নিতে পারেন । যেটা করতে হবে ছোট ছোট টবে লাউয়ের বিচি বপন করে ঘরের কোন একটা জানালার ধারে , যেখানে দিনের প্রধান সময়টা ( সকাল থেকে বেলা ১২/১ টা পর্যন্ত ) পর্যাপ্ত আলো পায় সেখানে রাখবেন । তবে বিষয় হলো - ছোট ছোট টব কোথায় পাবো , মাটিই বা কেমন হতে হবে? Bunnings এ সিড রাইজিং ট্রে পাওয়া যায় , অথবা মিচেলের green shade থেকে পুরানো গুলো জোগার করা যেতে পারে , অথবা নিজেদের পুরানো টবও থাকতে পারে। এ গুলোর বাইরে কিন্তু পরিবেশ বান্ধব আরও একটা সহজ উপায় আছে । টয়লেট রোল ব্যবহারের পরে শক্ত কাগজের যে রোলটা থাকে সেটা অনায়াসেই ব্যবহার করা যেতে পারে। একটা ব্যবহৃত পাত্র বা বাজার থেকে কেনা বিভিন্ন সবজির ফেলে দেয়া প্লাস্টিক কনটেইনারে, ফেলে দেয়া কাগজের রোল গুলো রেখে এর মধ্যে সাধারন পটিমিক্স ( Bunnings কিংবা Aldi র হতে পার) দুই তৃতীয়াংশ ভড়ে নিতে হবে। তারপর এর মধ্যে বীজ বপন করে আলো পাবে এমন জাগায় রেখে দেবো । এ ভাবেই থাকবে আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর শেষ পর্যন্ত । বীজ বপনের পর প্রথম বেশ কিছু দিন পানি দেয়া যাবেনা । ( খেয়াল রাখতে হবে মাটি যেনো আবার একদম শুকিয়ে না যায়) বীজের অংকুরদম হলে পরিমান মত পানি দিলেই চলবে । চাঁড়া পরিনত হলে নভেম্বরের প্রথম দিকে পারগোলা কিংবা ডেকে নিচে রাখতে হবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত । অথবা এমন একটা জাগা ঠিক করতে হবে যেখানে রাতের ঠান্ডা থেকে রক্ষা পায় ।এতে চাঁড়া বাইরের আবহাওয়ার সাথে সহনশীল হয়ে উঠবে । ডিসেম্বরের প্রথম দিকে কিংবা মাঝামাঝি মাটির তাপমাত্রা উপযুক্ত হলে তারপর মাটিতে লাগাতে হবে । অর্থাৎ তিনটা ধাপে কাজটা করতে হবেঃ
ধাপঃ ১
বীজ বপন - আগস্টের শেষে ( ঘরের মধ্যে )
ধাপঃ ২
পরিনত চাঁড়া বাইরে নিরাপদ জাগায় রাখতে হবে
( পরিবেশের সাথে সহনশীল হয়ে উঠবে)
ধাপঃ ৩
মাটির তাপমাত্রা উষ্ণ হলে তারপরই কেবল লাগানোর চিন্তা করতে হবে। ( ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অথবা মাসের মাঝামাঝি )
কাগজের রোল ব্যবহার করলে, রোল সহই মাটি তে রোপন করে দিলেই হবে। দারুন পরিবেশ সহায়ক একটা পদ্ধতি।
এখানে যে বিষয়টার উপর গুরুত্ব দিতে হবে তা হচ্ছে - বীজ থেকে সতেজ চাঁড়ার উৎপাদনের সাফ্যলের উপরই কিনতু লাউয়ের ফলনের সাফল্য নির্ভর করে ।
এই পদ্ধতির সুবিধা কিঃ
ডিসেম্বরে মাটির উষ্ণতা উপযুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই পরিনত চাঁড়া লাগানোর ফলে আগাম ও অধিক ফলন আশা করা যায় । অন্যদিকে ডিসেম্বরে যদি বিচি মাটিতে লাগানো হয় সেই গাছ পরিনত হয়ে ফলন শুরুর হতেই হতেই রাতে কিছুটা শীতের প্রকপ শুরু হয়ে যায় , সে ক্ষেত্রে ফলনও কমে যাবে । ডিসেম্বরে পরিনত চারা লাগালে আশা করা যায় জানুয়ারীর শেষের দিকে ফলন আশা শুরু করবে । অন্যদিকে ডিসেম্বরে মাটিতে বিচি লাগালে সেই গাছ পরিনত হতে হতে ফেব্রুয়ারি ।
সুতরাং নিংসন্দেহ এই পদ্ধতির সাফল্য হার হবে অধিক ।
বেশি শীতও না আবার বেশি গরমও না এমন আবহাওয়া লাউ চাষের জন্য উত্তম। তবে এই শহবেরে তাপমাত্রা অনেকটা রমনীর মনের মতই । কখন যে গরম কখন যে ঠান্ডা বুঝা বড়ই কঠিন । সেপ্টেম্বরের শেষ এমন কি অক্টোবরের মাঝামাঝিও তাপমাত্রা কমে যেতে পারে । সে ক্ষেত্রে এক রাতের ঠান্ডাই লাউ গাছের বিপর্যয়ের কারন হয়ে দাঁড়াতে পারে। সুতরাং নভেম্বরের শেষ কিংবা ডিসেম্বর আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা উত্তম ।
আপনার ব্যাকইয়ার্ড এই সময়টাতে কিছু ফুলের গাঁছ রাখুন । মনে রাখবেন গাছে ফুল আসলে , পরাগায়নের জন্য কীটপতঙ্গের দরকার পরে । সে ক্ষেত্রে আশেপাশে কিছু ফুল গাছ থাকলে বাগানে প্রচুর মৌমাছি কিংবা প্রজাপতির আগমন হবে , যা অধিক উৎপাদনে সহায়ক হবে।
বীজ নির্বাচনে এরটু সতর্কতা অবলম্বন করুন । চেষ্টা করুন পরিনত এবং সুস্হ্য বীজ নির্বাচন করতে ।
পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায় এমন জমি নির্বাচন করতে হবে। একই জমিতে বার বার একই ফসলের চাষ পরিহার করতে পারলে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের উপদ্রব কমানো যাবে। ব্যাপক শিকড় বৃদ্ধির জন্য জমি এবং গর্ত উত্তমরূপে তৈরি করতে হবে। যারা টবে করতে চান - খেয়াল রাখতে হবে টবের মাটি যেনো ভেড়া কিংবা গোবর সার সমৃদ্ধ উত্তম জৈব সার যুক্ত হয়।
লাউ বীজের খোসা কিছুটা শক্ত। তাই সহজ অংকুরোদগমের জন্য শুধু পরিস্কার পানিতে ১৫-২০ ঘন্টা অথবা Seasol মেশানো পানিতে এক রাত্রি ভিজিয়ে তারপর ছোট ছোট প্লাস্টিকের টবে বপন করতে হবে।
চাঁড়া মাটিতে লাগানোর পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ । এ সময়টা চাঁড়া সহজেই পোকামাকরের আক্রমনের স্বীকার হতে পারে। এই সময়টাতে যদি চাঁড়ার প্রথম ডগা snail কিংবা অন্য কোন পোকায় খেয়ে ফেলে তাহলে কিন্তু গাছের বৃদ্ধি থেমে যাবে। নিয়মিত নজর রাখতে হবে। প্রয়োজন বোধে snail killer ছড়িয়ে দিতে হবে।
লাউ ফসলের সারের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতিঃ যারা জৈব পদ্ধতি কে প্রধান্য দেন তারা Jamison Sunday Market থেকে ভেড়া ও গোবরের সার যোগার করে পরিমান মত মাটিতে প্রয়োগ করতে পারেন । নিয়মিত পানির ব্যবস্হা থাকতে হবে । আমাদের দেশে প্রচলিত ধারনা - চাল ধোঁয়া পানি লাউ গাছে বৃদ্ধি এবং ফলনে সহায়ক । এটাও প্রয়োগ করা যেতে পারে । সপ্তাহে একবার সীসল যুক্ত পানি নিয়মিত দিতে হবে।
চারা লাগানো থেকে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত সবসময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। গাছের গোড়ায় আগাছা থাকলে তা খাদ্যোপাদান ও রস শোষণ করে নেয় বলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় না। লক্ষ্য রাখতে হবে গাছের গোড়ার মাটি যেনো শক্ত হয়ে না যায় , এতে গাছের শিকড়াঞ্চলে বাতাস চলাচল ব্যাহত হয়। কাজেই মাঝে মধ্যেই গাছের গোড়ার মাটির নেরেচেরে দিতে হবে। গাছের গোড়ার দিকের ছোট ছোট ডগা (শোষক শাখা) গাছের ফলনে এবং যথাযথ শারীরিক বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটায়। তাই সেগুলো কেটে দিতে হয়। এতে গোড়া পরিষ্কার থাকে, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের উৎপাত কম হয় এবং আন্তঃকর্ষণের কাজ সহজ হয়।
রোগবালাই দমন ব্যবস্থাঃ
- পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ- খেয়াল রাখতে হবে আশপাশ যেনো পরিচ্ছন্ন থাকে ।
- চারা অবস্থায আক্রান্ত হলে হাত দিয়ে পূর্ণবয়স্ক পোকা ধরে মেরে ফেলতে হবে।
মোজাইক রোগঃ
চারা অবস্থায় বীজ গজানোর পর বীজপত্র হলুদ হয়ে যায় এবং পরে চারা নেতিয়ে পড়ে। বযস্ক গাছের পাতায় হলুদ-সবুজ ছোপ ছোপ মোজাইকের মতো দাগ দেখা যায়। দাগগুলো অসম আকারের। দ্রুত বড় হয়। আক্রান্ত পাতা ছোট, বিকৃত ও নিচের দিকে কোকড়ানো, বিবর্ণ হয়ে যায়। শিরা-উপশিরাও হলুদ হয়ে যায়। ফুল কম আসে এবং অধিক আক্রমণে পাতা ও গাছ মরে যায়। আক্রান্ত ফল বেঁকে যায় ও গাছের কচি ডগা জটলার মতো দেখায়। ফলের উপরি অংশ এবড়ো-খেবড়ো দেখা যায়।
প্রতিকার ব্যবস্থা
- আক্রান্ত গাছ দেখলেই প্রাথমিকভাবে তা তুলে ধ্বংস করা। ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার রাখা।
- রোগাক্রান্ত গাছ থেকে কোনো বীজ সংগ্রহ ও ব্যবহার না করা।
ফলন পরিনত হওয়া শুরু হলে নিয়মিত গাছ থেকে ফসল তুলুন। নিয়মিত ফসল সংগ্রহ , গাছের অধিক ফসল উৎপাদনে সহায়ক।
আপনারা যারা পরবর্তী বছরের জন্য বীজ সংরক্ষন করতে চান, মনে রাখতে হবে, ফল পরিপক্ক হওয়া শুরু হলে পানি দেয়া বন্ধ করে দিতে হবে।তারপর খুব সাবধানে গাছ থেকে ফল কেটে নিয়ে লাউ শুকানোর ব্যবস্হা করতে হবে।শুকনা লাউ কেটে সুস্হ বীজ সংগ্রহ করে আর্দ্র জায়গায় সংরক্ষন করবেন । আগ্রহী কৃষক/কৃষানী আমাদের “সিড ব্যাংকে” যোগাযোগ করতে পারেন । সবাই ভালো থাকবেন ।
-
পরবর্তী পরিচর্যা
লাউ ফসল পানির প্রতি খুবই সংবেদনশীল। প্রয়োজনীয় পানির অভার হলে ফল ধারণ ব্যাহত হবে এবং ফল আস্তে আস্তে ঝরে যাবে। কাজেই নিয়মিত পানি দিতে হবে । আমাদের এখানে ডিসেম্বর জানুয়ারীতে তাপমাত্রা কখনও কখনও ৪০/৪২ ও হয়ে যায় । সুতরাং অবশ্যই পানি প্রয়োগের দিকে নিয়মিত লক্ষ্য রাখতে হবে।
বাউনি বা মাচা দেয়া
লাউয়ের কাক্সিক্ষত ফলন পেতে হলে অবশ্যই মাচায় চাষ করতে হবে। লাউ মাটিতে চাষ করলে ফলের একদিক বিবর্ণ হয়ে যায়, ফলে পচন ধরে এবং প্রাকৃতিক পরাগায়ন কমে যায়। ফলে ফলনও কমে যায়। আমাদের বাসা গুলোতে সাধারনত খুব একটা অব্যবহৃত জায়গা থাকে না । সুতরাং মাচা তৈরি করাটা আমাদের জন্য সমস্যাই বলা যায় । তার উপর মাচা তৈরির উপাদান ও খুব একটা সহজলোভ্যও না । এখানে তো আর বাঁশের ঝাড়ের দেখা পাওয়া যায়না । Bunnings থেকে কাঁঠের ফ্রেম কিনে মাচা তৈরি করা যেতে পারে। তবে Mitchel Green Shed থেকে পুরনো কাঁঠ, ফেলে দেয়া লোহার নেট দিয়ে স্বল্প মূল্যে অনায়াসেই পরিবেশ বান্ধব মাচা তৈরি করা যেতে পারে।
বিশেষ পরিচর্যা
শোষক শাখা অপসারণ
গাছের গোড়ার দিকে ছোট ছোট ডালপালা হয়। সেগুলোকে শোষক শাখা বলা হয়। এগুলো গাছের ফলনে এবং যথাযথ শারীরিক বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটায়। কাজেই গাছের গোড়ার দিকে ৪০-৪৫ সেমি. পর্যন্ত ডালপালাগুলো ধারালো pruning secateurs দিয়ে কেটে দিতে হবে।
ফল ধারণ বৃদ্ধিতে কৃত্রিম পরাগায়ন
লাউয়ের পরাগায়ন প্রধানত মৌমাছির দ্বারা সম্পন্ন হয়। নানা কারণে লাউয়ের সব ফুলে প্রাকৃতিক পরাগায়ন ঘটে না এবং এতে ফলন কমে যায়। হাত দিয়ে কৃত্রিম পরাগায়ন করে লাউয়ের ফলন শতকরা ৩০-৩৫ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভর। লাউয়ের ফুল ঠিকমতো রোদ পেলে দুপুরের পর থেকে ফোটা শুরু হয়ে রাত ৭-৮টা পর্যন্ত ফোটে। কৃত্রিম পরাগায়ন ফুল ফোটার দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত এবং পরদিন সকাল পর্যন্ত করা যায়। তবে পরদিন সকালে পরাগায়ন করলে ফল কম ধরে কিন্তু ফুল ফোটার দিন সন্ধ্যাপর্যন্ত যে কয়টা ফুলে পরাগায়ন করা হয় তার সবটিতেই ফল ধরবে। কৃত্রিম পরাগায়নের নিয়ম হলো ফুল ফোটার পর পুরুষ ফুল ছিঁড়ে ফুলের পাপড়ি অপসারণ করা হয় এবং ফুলের পরাগধানী (যার মধ্যে পরাগরেণু থাকে) আস্তে করে স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডে (যেটি গর্ভাশয়ের পেছনে পাপড়ির মাজখানে থাকে) ঘষে দেয়া হয়। একটি পুরুষ ফুল দিয়ে ২-৪টি স্ত্রী ফুলে পরাগায়ন করা যায়।
লাউয়ের 3G Method সম্পর্কে অন্য প্রতিবেদনেই বিস্তারিত আলোচনা করেছি । আগ্রহীরা চাইলে সেটা অনুসরন করতে পারেন ।